মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা এ ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এশিয়ার মুদ্রাবাজারে। বিনিয়োগকারীরা এশীয় বাজার থেকে তাদের বিনিয়োগ সরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মার্কিন ডলার ও স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে এশিয়ার দেশগুলোর মুদ্রার বিনিময় হার ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এ পরিস্থিতি এ অঞ্চলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
গত সপ্তাহের শেষ দিকে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পরই বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফলে তারা ঝুঁকি এড়াতে এশীয় মুদ্রা বিক্রি করে দিচ্ছেন। এ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর। চলতি সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার মুদ্রা ‘ওন’-এর বিনিময় হার কমে প্রতি ডলারে ১ হাজার ৫০০ ওনের নিচে নেমে গেছে। ২০০৯ সালের বিশ্ব মন্দার সময় দেশটির মুদ্রার এমন ভয়াবহ দশা হয়েছিল। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ওনের বিনিময় হার ২ শতাংশের বেশি কমে গেছে, যা বাজারের বর্তমান নাজুক অবস্থাকেই ফুটিয়ে তুলছে।
সাধারণত জাপানি মুদ্রা ইয়েনকে বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ মনে করা হয়। তবে বর্তমান সংকটে ইয়েনও চাপের মুখে পড়েছে। জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জাপানের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে ইয়েনের বিনিময় হার প্রায় ১ শতাংশ কমে গেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ইরানের এ দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে ব্যাংক অব জাপান তাদের সুদের হার বাড়ানোর পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে দেশটির সরকারও অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার না বাড়াতে চাপ দিতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এতে ইয়েনের বিনিময় হার আরো পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোও এ অস্থিরতা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। সিঙ্গাপুর ডলার, থাই বাত, ফিলিপাইন পেসো, ইন্দোনেশিয়ান রুপিয়াহ ও মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের ওপর ব্যাপক বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। এমনকি বাদ পড়েনি মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের দরপতনও। মালয়েশিয়া একটি তেল রফতানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও তাদের মুদ্রার বিনিময় হার কমেছে। এটি প্রমাণ করে যে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি এতটাই অনিশ্চিত যে তেল রফতানি করেও কোনো দেশ মুদ্রাবাজারের এ অস্থিরতা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারছে না।
মুদ্রাবাজারের পাশাপাশি এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোয়ও বড় ধরনের ধস নেমেছে। গতকাল সকালে জাপানের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক ‘নিক্কেই’ একপর্যায়ে ৭০০ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৪ শতাংশ পড়ে যায়। গত সপ্তাহের তুলনায় সূচকটি ৩ হাজার ৩০০ পয়েন্টের বেশি নিচে অবস্থান করছে। একই চিত্র দেখা গেছে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘কসপি’ ও অস্ট্রেলিয়ার শেয়ারবাজারেও। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে ভয় পাচ্ছেন বলে সর্বত্রই শেয়ার বিক্রির হিড়িক লক্ষ করা যাচ্ছে।
এ অর্থনৈতিক সংকটের মূলে রয়েছে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম। ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম প্রতি ব্যারেলে ৮০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। মাত্র এক সপ্তাহে তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন জ্বালানি তেলের দাম সামান্য বাড়লেও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া বেশি জরুরি। কিন্তু এশিয়ার দেশগুলোর জন্য বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও কাঁচামালের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তেলের দাম বাড়লে এসব দেশে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে যায়, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলে। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় এশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বড় সংকটে পড়েছে। তারা একদিকে চাচ্ছে সুদের হার কমিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের হয়তো উল্টো সুদের হার বাড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন, তেলের দাম বাড়লে এশিয়ার দেশগুলোর আমদানি ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে এবং স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার আরো কমে যাবে। যতক্ষণ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে এ অস্থিরতা বজায় থাকবে, ততক্ষণ মার্কিন ডলার শক্তিশালী থাকবে এবং এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীল থাকার আশঙ্কা রয়েছে।